পুরুষের হিজাব, পুরুষের শালীনতা- -আইনুল বারী
১০৭. পুরুষের হিজাব, পুরুষের শালীনতা-
-আইনুল বারী
---------------------
-পুরুষের হিজাব, পুরুষের শালীনতাবোধ-
(১) আলোচনায় হিজাব প্রসঙ্গ উঠলেই আমাদের
সাধারণত মনে হয়, নারীদের হিজাব। এ হলো নারীদের শালীনতাবোধ
নিয়ে কথা, নারীদের যৌনাঙ্গের হেফাজত ও বাইরের
মানুষের সামনে সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখার জন্যে নির্ধারিত পোশাক-পরিচ্ছেদ ও সাজ-সজ্জার
বিষয়াদি। পুরুষের হিজাব প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে কম। তবে হিজাব, যাকে আমরা বলতে পারি পোশাকের শালীনতা,
এটি শুধু
নারীর ক্ষেত্রে নয়, পুরুষের ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর চেয়ে পুরুষের শালীনতার প্রয়োজনীয়তা কম,
এমন ভাবার
কোনো সুযোগ নেই, অন্তত ইসলামের শিক্ষা তা নয়। তবে আমরা না
বুঝে হিজাব নিয়ে বাড়াবাড়িও করি। এই বাড়াবাড়ির কারণ মুসলিম সমাজের প্রভাবশালী কট্টর
মোল্লাতন্ত্র, যে তান্ত্রিকতা কুসংস্কার ও বিভ্রান্তির
কারণে নারীকে পোশাকের মধ্যে ও ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখতে চায়। অথচ কুর’আনের শিক্ষা নারীকে বন্দীত্ব নয়,
নারীর
মুক্তি।
‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রী ও কন্যাদের আর
বিশ্বাসী নারীদের বলে দিন, তারা যেনো তাদের ওড়না নিজেদের উপর জড়িয়ে নেয়। তাদেরকে চিনতে পারার জন্য এটি অপেক্ষাকৃত ভালো
উপায়, আর এতে তারা উত্যক্ত হবে না, আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।’
-সুরাহ
আহযাব (অধ্যায়-৩৩), আয়াত-৫৯
‘যারা বয়স্ক নারী, বিবাহিত জীবনের আশা নেই, তাদের কোনো
অপরাধ নেই যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে বর্হিবাস খুলে রাখে, আর যদি এ হতেও বিরত থাকে, তবে এটা
তাদের জন্য আরো ভালো। আল্লাহ সব কিছু শোনেন,
জানেন।‘ -সুরাহ নূর(অধ্যায়-২৪), আয়াত ৬০
(২) আল্লাহ বলেছেন, তাকওয়ার (ধার্মিকতার) পোশাকই উত্তম,
আর নারী ও
পুরুষ উভয়কেই বলেছেন, দৃষ্টিকে নিচু রাখতে। শালীনতা শুধু
পোশাকের নয়, মনেরও। পোশাকের শালীনতা থাকলেও অশালীন
দৃষ্টি শালীন পোশাককেও কলংকিত করতে পারে। অশালীন মন শালীন পোশাককে ভাবতে পারে
ফেটিশ হিসেবেও। আল্লাহ বলেছেন, পোশাক
লজ্জা নিবারণের জন্যে ও সাজ-সজ্জার জন্যেও। তবে নিজের সৌন্দর্য বাইরের মানুষের
কাছে প্রদর্শন করাও উচিত নয়। এই লজ্জাবোধ ব্যক্তিত্বের ব্যাপার, আত্মোপলব্ধির ব্যাপার।
‘হে আদম সন্তানেরা! আমি তোমাদের পোষাক
সৃষ্টি করেছি তোমাদের লজ্জা নিবারণের জন্য,
আর
সৌন্দর্যের জন্য, তবে তাকওয়ার (আল্লাহ-সচেতনতার,ধার্মিকতার) পোশাকই উত্তম; এটি
আল্লাহর অন্যতম একটি নিদর্শন, যেনো তারা
মনে রাখে।’ -সুরাহ আ’রাফ
আয়াত-২৬
কখনো এমন প্রশ্নও তোলা হয়, নারীদের
হিজাব প্রসঙ্গে বিস্তারিত আয়াত আছে,
পুরুষের
প্রসঙ্গে নেই কেনো? না থাকলে কি ভেবে নেয়া যাবে যে পুরুষেরা
নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করলে সেটি অনুচিত হবে না?
অথবা যারা
অমুসলিম খোলামেলা পোশাকে অভ্যস্ত নারী বা ন্যুডিস্ট,
তাদের দিকে
কি তাকিয়ে থাকা শোভনীয় হবে? নিশ্চয় তেমন নয়। আল্লাহ বলেছেন,
‘হে আদম সন্তানেরা! শয়তান যেনো তোমাদেরকে
ধোঁকায় না ফেলে, যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে স্বর্গ থেকে
বের করে দিয়েছিলো, সে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য তাদেরকে
বিবস্ত্র করেছিলো; সে ও তার দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে, অথচ তোমরা তাদেরকে দেখো না;
যারা ঈমান
আনে না আমি শয়তানকে তাদের অন্তরংগ বন্ধু করেছি।'-সুরাহ আ’রাফ আয়াত-২৭
‘বিশ্বাসী পুরুষদেরকে বলো, তারা যেনো তাদের নজরকে নিচু করে ও শালীনতা বজায় রাখে; এ হলো তাদের অধিকতর শুদ্ধতার জন্য;
নিশ্চয়
আল্লাহ জানেন তারা যা করে।’
–সূরাহ নূর(অধ্যায়-২৪),আয়াত-৩০
‘আর বিশ্বাসী নারীদেরকে বলো, তারা যেনো তাদের নজরকে নিচু করে ও শালীনতা বজায় রাখে; আর যেনো সাধারণ প্রকাশমান ছাড়া নিজেদের সাজসজ্জাকে প্রদর্শন না করে, যেনো তাদের মাথার ওড়না বুকের উপর টেনে/জড়িয়ে রাখে, আর যেনো তাদের সৌন্দর্য-সাজ-সজ্জা অন্যের সামনে প্রদর্শন না করে, তবে স্বামী, বাবা,
শ্বশুর, ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, তাদের তত্ত্বাবধায়নে থাকা নারী, কাজের মেয়ে(দাসী), যৌনকামনামুক্ত কাজের লোক, শিশু যা্দের নারী অঙ্গ সম্পর্কে ধারণা নেই,
তারা ছাড়া; আর তারা যেনো সজোরে না হাঁটে যে তাদের একান্ত সৌন্দর্য-সাজ-সজ্জা প্রকাশিত
হয়ে পড়ে; ওহে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে
অনুশোচনা করো, যেনো সফল হতে পারো।’
–সূরাহ নূর(অধ্যায়-২৪),আয়াত-৩১
(৩) ইসলামের সমালোচকেরা নারীর হিজাব নিয়ে
অনেক অভিযোগ করে থাকেন, কেনো একটি মেয়েকে যৌনতার বস্তু ভাবতে হবে? মুসলমান পুরুষেরা কেনো মেয়েদেরকে এভাবে চিন্তা করে? এমন চিন্তাই অশালীন। নিশ্চয় নারীদেরকে যৌনতার ভোগ্য বস্তু হিসেবে দেখা একটি
অশালীন বাজে চিন্তা, যা করে থাকে পুঁজিবাদী ভোগবাদী সমাজ, যেখানে নারীকে (এবং পুরুষকেও) পণ্য হিসেবে মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়, তার যৌনতাকে, নগ্নতাকে ব্যবহার করে মুনাফা অর্জন করা
হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মে নারীকে এভাবে চিন্তা করা ও উপস্থাপন করা খুব নিন্দনীয় কাজ।
মুসলমান পুরুষদের এমন অশালীন ভাবনা-চিন্তায় মগ্ন হওয়া উচিত নয়, সেজন্যেই শুধু নারীকেই নয়, পুরুষকেও
দৃষ্টিকে নত রাখতে বলা হয়েছে। তবে অনুচিত হলেও বাস্তবতা ভিন্ন হয়; বিভিন্ন সমাজে মানুষে মানুষে শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কৃতিগত প্রভেদ
রয়েছে বলেই কোনো সমাজে একজন নারী একাকী নিরাপদে পথ চলতে পারলেও আরেকটি সমাজে সে
অপমানিত হয়।
কুর’আনের হিজাব সংক্রান্ত আয়াতগুলি থেকে
শিক্ষা নিয়ে আমরা যেমন নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারি, তেমনি সামাজিক পরিমিতিবোধ অর্জন করতে পারি। যারা বলবেন, পশ্চিমকে অনুসরণ করুন, তারা যেনো
এ কথা ভুলে না যান, পশ্চিমা সভ্যতা বলে যাকে অন্ধের মতো
অনুসরণ করছি, তা কিন্তু ভোগবাদী বাজার অর্থনীতিরই
প্রক্ষেপণ মাত্র।
Comments
Post a Comment