মৃত্যুদন্ডের শাস্তিঃ কুর’আনের শিক্ষা কী? -আইনুল
৩৪.মৃত্যুদন্ডের শাস্তিঃ কুর’আনের শিক্ষা কী?
-আইনুল বারী
-- --- ---
মানবতার পক্ষে ইসলামের শিক্ষাকে অনুধাবনের জন্য আমি এখানে একটি
বিষয়বস্তুকে বেছে নিচ্ছি, তা হলোঃ নরহত্যার শাস্তি প্রসংগ। কুর'আন থেকেই আমি আমার এই লেখাটির সারসংক্ষেপ
করেছি।
..........................................
যখন কোনো নরহত্যার অপরাধ সংঘটিত হয় তখন ভিক্টিমের অধিকার রয়েছে
যে অপরাধীর তার উপযুক্ত শাস্তি পাবে। কিন্তু কেমন হবে সেই উপযুক্ত শাস্তির বিধান? আমি প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার সাথে কুর'আনের আলোকে নরহত্যার শাস্তি বিষয়টিকে তুলে ধরতে
চেষ্টা করবোঃ
(১) আধুনিক বিচার পদ্ধতিতে হত্যাকান্ডের
শাস্তি কী ধরণের হতে পারে?
অনুধ্যান করি বা গবেষণা করি শাস্তি বিষক মতবাদ গুলির বিচার- মানদন্ড বা তা নীতি বা মূল্য-পদ্ধতিকে
তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারেঃ-
ক। যৌক্তিক বিচার মূল্য-
অর্থাৎ প্রাণের বদলে প্রাণ।কেউ হত্যা করলে তার শাস্তি হবে
মৃত্যুদন্ড।
একে শাস্তি বিষয়ক প্রতিশোধাত্মক মতবাদ বললেও এটি কাল ভেদে
নিষ্ঠুর প্রতীয়মান হলেও কিন্তু যৌক্তিক। বর্তমান বিশ্ব পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে
নরহত্যার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। সপ্তম শতকেও এটি সামাজিক
মূল্যবোধ পরিপন্থী ছিলো না। সমালোচনাঃ- তব আজকের বিশ্বে অনেক দেশে মৃত্যুদন্ডকে নিষ্ঠুরতা
বলে মনে করা হয়, তাই মৃত্যদন্ডের
বিধান বাতিল করা হয়েছে। এর একটি সমালোচনা করা যায় যে এটি যৌক্তিক মনে হলেও
প্রয়োগবাদী নয়, বরং এটি
প্রতিশোধাত্মক বিধান। কারণ আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় বিচারকের সিধান্তই শেষ কথা, সেখানে ভিক্টিম পরিবারের জন্য অভিযোগ দায়ের করা ও
স্বাক্ষ্য দেয়া ছাড়া বাকিটা থাকে সান্ত্বনামূলক। যে খুনীর বিচার হলো, সে শাস্তি পেলো।
খ। প্রয়োগবাদী বিচার মূল্য-
এখানে বাদী পক্ষ অর্থাৎ ভিক্টিম পরিবার যদি অত্যন্ত গরীব হয় আর
মনে করে তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বা জীবন ধারণের জন্য খুনী যদি যথাযোগ্য অর্থ
ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয় তবে সে তার মৃত্যু দন্ডের চেয়ে সেটাই কাংখিত মনে করে তবে
ইসলামে সে সুযোগ তাকে দিতে হবে। এখানে বিচারকের মতামত মূখ্য বিবেচ্য নয়। এটা হলো
ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে শাস্তি লাঘবের বিধান। এটি পার্থিব লাভের আশায় প্রয়োগবাদী
বিধান।
গ। আধ্যাত্মিক বিচার মূল্য- যদি অপরাধী খুনী আত্ম-অনুশোচনায় নিজেকে সংশোধন
করতে চায় তবে খুনীকে নিঃ শর্ত ক্ষমাও করে দেয়ারও উদার নৈতিক সুযোগ রয়েছে। ক্ষমার মাধ্যমে পরকালের
উপার্জনের জন্য ভিক্টিম বা বাদী পক্ষ চাইলে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এটি
মানুষের মূল্যবধের সব চেয়ে উচ্চতর পর্যায়, যা দয়াময় আল্লাহ সব চেয়ে বেশি পছন্দ করেন এবং ক্ষামশীল ব্যক্তি
বা পরিবারের এই ঔদার্যকে 'সদকা' হিসেবে পরকালে প্রতিদান দেন। মানবতাবাদের এ হলো সবচেয়ে শ্রেয়তর
পথ।
২) ক। এখন আমি নিচে একটি আয়াত বর্ণনা করবো,
'আমি এ গ্রন্থে তাদের জন্য নির্দেশ করেছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখমের বদলে সমান যখম। কিন্তু যে
(বদান্য হিসেবে) ক্ষমা করে, তার পাপ মোচন হয়। যে
সব মানুষ আল্লাহর প্রত্যাদেশ অনুযায়ী তদনুযায়ী বিচার করে না তারা বিভ্রান্ত।' -সুরাহ মাই-দাহ, ৫ঃ৪৫
এই আয়াতটিতে যৌক্তিক প্রতিশোধের যেমন বিধান রাখা হয়েছে, তেমনি নিঃশর্ত ক্ষমার মাধ্যমে পরকালের জন্য
পুরষ্কার তথা আধ্যাত্মিক অর্জনের বিধান রাখা হয়েছে।
খ। পবিত্র কুর'আনে 'কিসাস' পদ্ধতি বর্ণিত আছে সুরা বাক্বারাহের ১৭৮ নং আয়াতে,
'হে বিশ্বাসীগণ, তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করার
বিধান রাখা হয়েছেঃ স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তির, আর দাস বদলে দাসের, আর নারী বদলে নারীর । এরপরও যদি কেউ তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে যদি
কাউকে কিছুটা মাফ করে দেয়া হয়, তবে প্রচলিত
নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার
তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও কেউ যদি বাড়াবাড়ি করে, তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক পরিণতি। '-সুরাহ বাক্বারাহ, ২ঃ ১৭৮
এই আয়াতে যৌক্তিক প্রতিশোধ ও ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে নিষ্পত্তির
বিধানের কথা বলা হয়েছে।
এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার 'কিসাস বিধানের' মাধ্যমে নায্য
প্রতিশোধ যেমন নিতে পারেন তেমনি প্রতিশোধের পরবর্তে 'দিয়া' ক্ষতিপূরণ বিধানের মাধ্যমে কিছুটা ছাড় দিয়ে এর নিষ্পত্তি করতে
পারে। 'কিসাস' পদ্ধতি গোত্রভিত্তিক সমাজের পচলিত ছিলো, কিন্তু কিসাসের পরিবর্তে 'দিয়া' পদ্ধতির প্রচলন হয়। একে 'রক্তমূল্য' বলা হয়। এটির রয়েছে প্রয়োগবাদী মূল্য। শাস্তি
বিষয়ে এটি প্রতিশোধাত্মক বিধানের বদলে প্রয়োগবাদী মানবতাবাদী বিধানকে প্রচলন করে।
গ। কুর'আনের বিভিন্ন আয়াতে অনুশোচনায় দগ্ধ
আত্ম-সংশোধিত অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়ার অনুপ্ররণালে অনেক উচ্চে স্থান দেয়া হয়েছে।
পার্থিব প্রাপ্তির চেয়ে বড় পরকালের প্রাপ্তি, যা ক্ষমার মাধ্যমে সদকা হিসেবে গৃহীত হবে আল্লাহর কাছে।
রক্তমূল্যকে হ্রাস করে যে সদকা আদায় হয় বিনা রক্তমূল্যে সে সদকার পরিমাণ পরকালের
জন্য অনেক বেশি হয়। আজকের সভ্যতায় মানবজাতি সেরাটিই বেছে নেবে।
৩) এ পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারি প্রথমতঃ সারা বিশ্বে আমাদের প্রচলিত আইন ও বিচার
কাঠামোয় যেখানে বাদী পক্ষ বা ভিক্টিম/ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বিচারের রায় নিষ্পত্তির
ব্যাপারে কোনো ক্ষমতা বা মতামতের অধিকার বা স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে না সেখানে ইসলামে
বাদী পক্ষ বা ভিক্টিম/ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেই সেই সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয়তঃ আমাদের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা পুরোটাই পার্থিব
অর্জনের জন্য এবং তা নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রের কতৃত্বে থাকে। এবং তা প্রতিশোধাত্মক, কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি লাঘব করা হলেও(মৃত্যুদণদের
বদলে আজীবন কারাবাস)। বাদী পক্ষ বা ভিক্টিম/ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ইচ্ছা, মতামত, স্বার্থ এখানে বলা চলে অনুপস্থিত।
অন্যদিকে, ইসলাম বর্ণনা
করছে গোত্রভিত্তিক সমাজের নৈতিক মূল্য বিবেচনায় রেখে, আধুনিক সমাজের নৈতিক মানদণ্ডও বিবেচিত, এমন কি নিঃশর্ত ক্ষমার এমন উদার এক মূল্যমান
যেখানে আজো আধুনিক কোনো সভ্যতা পৌঁছুতে পারে নি।
পরিশেষে পবিত্র কুর'আনের আরেকটি আয়াতের এই অংশটুকু হৃদয়ে ধারণ করতে বলবো, যেখানে মহান আল্লাহ বলেছেন,
'...ঐ প্রাণ কেড়ে নিয়ো
না যা আল্লাহ পবিত্র করেছেন,আইন ও বিচারের
পথ ছাড়া । এ ভাবেই তিনি তোমাদের নির্দেশ করেন, যেনো তোমরা প্রজ্ঞা লাভ করতে পারো।'-সুরাহ আন'আম, ৬ঃ১৫১
Comments
Post a Comment