অপব্যাখ্যাত আয়াত-৯:৫-'যেখানে পাও মুশরিকদের হত্যা করো...' -আইনুল
২১.অপব্যাখ্যাত
আয়াত-৯:৫-'যেখানে পাও মুশরিকদের হত্যা করো...'
-আইনুল বারী
--- --- --
‘অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের(পৌত্তলিক প্যাগানদের) হত্যা করো যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাকো।...’
আয়াত ৯:৫= ‘অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের(পৌত্তলিক প্যাগানদের) হত্যা করো যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা(অনুশোচনা)করে, সালাত আদায় করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
সমালোচকদের দ্বারা আয়াতটি নাজিলের নেপথ্যের ঘটনা তথা তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়া এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয় যেনো মানুষের সন্দেহবাতিক ও দুর্বল মনে ইসলাম সম্পর্কেই নেতিবাচক ধারণার ছাপ ফেলে। যেনো এমনই বোঝা যায় যে শান্তি নয় বরং যুদ্ধ রক্তপাত ও হিংসা-ক্রোধের ধর্ম হলো ইসলাম।
এই আয়াতের পুরো কন্টেক্সটটি ৯:১ থেকে ৯:১৪ পর্যন্ত বিধৃত হয়েছে। ১ নং আয়াতে মুসরিকদের সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্নকরণের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ছত্রে ছত্রে পুরো বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। সম্পর্ক ছ্বেদের সাথে সাথেই শান্তি চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। এখন লক্ষ্ করি পুরো কন্টেক্সটটিঃ
৯:১ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করা হল, সেই মুশরিকদের(অবিশ্বাসী পৌত্তলিকদের) সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।
৯:২ অতএব দেশে চার মাস মুক্তভাবে বিচরণ করো । আর জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহকে ব্যার্থ করতে পারবে না, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।
৯:৩আর মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরেকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা করো, তবে তা, তোমাদের জন্যেও কল্যাণকর, আর যদি মুখ ফেরাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না। আর কাফেরদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দাও।
৯:৪তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ করো। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।
৯:৫অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
৯:৬আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়, তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।
৯:৭মুশরিকদের চুক্তি আল্লাহর নিকট ও তাঁর রসূলের নিকট কিরূপে বলবৎ থাকবে। তবে যাদের সাথে তোমরা চুক্তি সম্পাদন করেছ মসজিদুল-হারামের নিকট। অতএব, যে পর্যন্ত তারা তোমাদের জন্যে সরল থাকে, তোমরাও তাদের জন্য সরল থাক। নিঃসন্দেহের আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।
৯:৮কিরূপে? তারা তোমাদের উপর জয়ী হলে তোমাদের আত্নীয়তার ও অঙ্গীকারের কোন মর্যাদা দেবে না। তারা মুখে তোমাদের সন্তুষ্ট করে, কিন্তু তাদের অন্তরসমূহ তা অস্বীকার করে, আর তাদের অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী।
৯:৯তারা আল্লাহর আয়াত সমূহ নগন্য মুল্যে বিক্রয় করে, অতঃপর লোকদের নিবৃত রাখে তাঁর পথ থেকে, তারা যা করে চলছে, তা অতি নিকৃষ্ট।
৯:১০তারা মর্যাদা দেয় না কোন মুসলমানের ক্ষেত্রে আত্নীয়তার, আর না অঙ্গীকারের। আর তারাই সীমালংঘনকারী।
৯:১১অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি।
৯:১২আর যদি ভঙ্গ করে তারা তাদের শপথ প্রতিশ্রুতির পর এবং বিদ্রুপ করে তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে, তবে কুফর প্রধানদের সাথে যুদ্ধ কর। কারণ, এদের কেন শপথ নেই যাতে তারা ফিরে আসে।
৯:১৩তোমরা কি সেই দলের সাথে যুদ্ধ করবে না যারা তাদের শপথ ভংগ করেছে, আর যারা দৃঢ় পরিকল্পনা এঁটেছে/ষরযন্ত্র করছে রাসুলকে বহিষ্কারের/উৎখাতের, আর (তারাই)প্রথম তোমাদের উপর আক্রমণের সূচনা করেছে?তোমরা কি তাদেরকে ভয় করো? অথচ আল্লাহকেই তোমাদের ভয় করা উচিত, তোমরা যদি বিশ্বাসী হও।
ব্যাখ্যাঃ
১) পবিত্র কুর’আনের ৯ নং সূরাহ ‘তওবা’ ১১৩ নং প্রত্যাদেশকৃত সূরাহ হিসেবে বিবেচিত।সুরাটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলো, মদিনার মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে মক্কাবাসী কুরায়েশ সম্প্রদায়ের মধ্যেকার স্বাক্ষরিত দশ বছর মেয়াদী যুদ্ধ বিরতি ও শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের জন্য হুদায়বিয়াহ শান্তিচুক্তিটি (মক্কার কুরায়েশ সম্প্রদায় কর্তৃক) লংঘনের কার্যকারণ।এটিকে দেখা যেতে পারে ইসলা্মী রাষ্ট্রের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পন্নকারী মক্কার কূরায়েশ সম্প্রদায়ের শাসক গোষ্ঠীর যুদ্ধবিরতি চুক্তি লংঘন ও ষরযন্ত্রের অপরাধ। অর্থাৎ আয়াতগুলি এমন পরিস্থিতির বর্ণনা করে যখন মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,এবং যার রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন নবী মুহাম্মদ(তাঁর প্রতি শান্তি); রাষ্ট্র ও তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তিলংঘনকারী শ্ত্রু পক্ষ যুদ্ধরত। এমন বহঃশত্রুর যুদ্ধ-বিগ্রোহ ও ষরযন্ত্রের বিরুদ্ধে ন্যায়যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ও যুদ্ধের পরিস্থিতিতেও ইসলামের নৈতিকতা বজায় রাখা বিষয়ে আদেশ-নির্দেশ আকারে মানুষের শিক্ষার জন্য প্রজ্ঞা রয়েছে আয়াতগুলিতে। আজকের যুগেও পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্র শান্তিলঙ্ঘঙ্কারীদের বিরুদ্ধে ও নিজেদের অধিকার, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য, নিরাপত্তার জন্য আক্রমণকারী বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে ্জান-প্রাণ দিয়ে লড়াই করবে। পৃথিবীর বুকে ন্যায় যুদ্ধ যমর্থনযোগ্য, যদিও যুদ্ধ অনেক রক্তপাত ঝড়ায়। কিন্তু ন্যায়যুদ্ধ অন্যায়যুদ্ধের বিরুদ্ধে, তা অন্যায়যুদ্ধকে বন্ধ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্য বিস্তারকারী, সম্প্রসারণবাদী, অন্যায় চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে সকল দেশের দেশপ্রেমিক প্রতিরক্ষাবাহিনী ও জনগণ প্রস্তুত থাকে। এটি অন্যায় নয়, বরং এটিই ন্যায়ের পথ।
২) এখানে বলা হচ্ছে যুদ্ধরত গোষ্ঠী শান্তির পথে ফিরে এলে শান্তিচুক্তির যথাযথ মর্যাদা দিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ না করতে। শত্রু শিবিরের কেউ আত্ম-সমার্পণ করলে বা সংশোধিত হলে বা বিশ্বাস এনে রাষ্ট্রের নিয়ম-নীতির আনুগত্য করলে তার কোনো ক্ষতি না করতে।
৩) চুক্তিভঙ্গকারীদের ৪ মাস সময় দেয়ার মহানুভবতা আছে। আজকের যুগেও যুদ্ধরত দুটি শত্রু রাষ্ট্রের বিবাদ মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়ার এমন সুযোগ প্রদানের দৃষ্টান্ত বিরল।
৪) ৯ঃ৬ নং আয়াতটি যদি আমরা লক্ষ করি যুদ্ধের বন্দী কোনো শত্রু্র জন্য মানবতার এমন উদার দৃষ্টান্ত কোথায় আছে? আধুনিক যুদ্ধ -নৈতিকতাও (যুদ্ধবন্দী শ্ত্রুর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে) কি এমন উদারতায় পৌঁচেছে?
Comments
Post a Comment